আগুন, উসকানি ও নীরব ষড়যন্ত্র বাংলাদেশ কোন পথে?


প্রকাশের সময় : ২৪/১২/২০২৫, ৫:১৩ অপরাহ্ন
আগুন, উসকানি ও নীরব ষড়যন্ত্র বাংলাদেশ কোন পথে?
সম্প্রতি একই দিনে, মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে—দেশের তিনটি ভিন্ন স্থানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এই আগুন কি কেবলই একটি নিছক ঘটনা? নাকি কোনো সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র? এমন ভয়াবহ ঘটনায় সচেতন নাগরিকদের মনে গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঘটনাগুলো আলাদা আলাদা মনে হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—প্রতিটি ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে উসকানি, আবেগ এবং আগুন। এই তিন উপাদানের পুনরাবৃত্তি কি নিছক কাকতালীয়?
১৯ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু দাস নামে এক কারখানা শ্রমিককে আগুনে পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অভিযোগ—ধর্ম অবমাননা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অভিযোগটি সর্বপ্রথম কে তুললো? কে যাচাই করলো অভিযোগের সত্যতা? আইন, আদালত ও রাষ্ট্রের বাইরে গিয়ে কে জনগণকে হত্যার অধিকার দিল? ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে সহিংসতা ঘটানো আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়। অতীতেও আমরা দেখেছি—এ ধরনের ঘটনায় সাধারণ মানুষ সামনে থাকে, কিন্তু নির্দেশদাতারা থাকে অদৃশ্য। দীপু দাসের হত্যাকাণ্ড তাই শুধু একটি সাধারণ কোনো ঘটনা নয়, এই ঘটনা রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর ওপর সরাসরি আঘাত করেছে।
এর আগের দিন, ১৮ ডিসেম্বর রাতে সিঙ্গাপুর থেকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদীর মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ধরনের আবেগঘন পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই আবেগকে উসকে দেয় কিছু তথাকথিত অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট। পরিণতিতে, উত্তেজিত জনতার একটি অংশ দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যম প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে হামলা চালায়, ভাঙচুর করে এবং আগুন লাগিয়ে দেয়। প্রশ্ন উঠছে—আবেগ কি সংবাদমাধ্যমে আগুন লাগানোর বৈধতা দেয়? মতভিন্নতা কি সহিংসতার লাইসেন্স? এই হামলা কেবল দুটি মিডিয়া অফিসের ওপর নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ওপর সরাসরি আঘাত করেছে বাস্তবিক ভাবে। এ নিয়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই মন্তব্য করছেন যে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার মূলত দিল্লিকেন্দ্রিক এজেন্সির হয়ে বাংলাদেশে কাজ করে; সুতরাং তাদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা নাকি ‘ভালোই হয়েছে’। ব্যক্তিগতভাবে আমিও এই দুই পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতি, অবস্থান ও ভূমিকার ঘোরবিরোধী—এ বিষয়ে আমার কোনো দ্বিধা নেই। কিন্তু এখানেই থেমে গেলে চলবে না। কারণ, কোনো গণমাধ্যমের বিরোধিতা করা এক জিনিস, আর আবেগের জোয়ারে ভেসে গিয়ে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনাকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করা আরেক জিনিস। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাকে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে—যা ঘটেছে, তা কি সত্যিই আমার দেশের স্বার্থে হয়েছে? এতে কি রাষ্ট্র, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হয়েছে, নাকি এতে ক্ষতির বীজ আরও গভীরে বপন করা হলো? আমাদের মনে রাখতে হবে, নীতিগত বিরোধিতা কখনোই নৈরাজ্য, সহিংসতা বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বৈধতা দিতে পারে না। আজ যদি আমরা অপছন্দের গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া অন্যায়কে ‘ভালো হয়েছে’ বলে মেনে নিই, কাল সেই একই মানদণ্ড আমাদের নিজের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হতে পারে। তখন আর আপত্তি জানানোর নৈতিক জায়গাটুকুও আমাদের থাকবে না। তাই আবেগ নয়—চিন্তা করতে হবে। স্লোগান নয়—গবেষণা করতে হবে। দেখতে হবে, এসব ঘটনার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াল, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের পরিবেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হলো, এবং সবচেয়ে বড় কথা—এতে সাধারণ মানুষের জীবনে আদৌ কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এলো কি না। প্রশ্নটা তাই প্রথম আলো বা ডেইলি স্টারকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়; প্রশ্নটা রাষ্ট্রের চরিত্র, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আমাদের সামষ্টিক ভবিষ্যৎ নিয়ে। যা ঘটেছে, তা কি আমাদের দেশকে শক্তিশালী করেছে, নাকি দুর্বল? এ প্রশ্নের সৎ উত্তর খুঁজে বের করাই এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি।
এদিকে ১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে লক্ষ্মীপুরে এক বিএনপি নেতার বাড়িতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। তিনি প্রাণে বাঁচলেও, তার এক কন্যাসন্তান নিহত হয় এবং অপর কন্যার শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ পুড়ে যায়। এটি কি নিছক দুর্ঘটনা? নাকি কোনো রাজনৈতিক সহিংসতার কোনো ভয়াবহ অধ্যায়? নাকি শত্রু রাষ্ট্রের কোনো গভীর ষড়যন্ত্র? যে আগুন একজন শিশুর জীবন কেড়ে নেয়, সেটি কোনো রাজনীতির অংশ হতে পারে না—এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। তিনটি ঘটনা, একটি প্যাটার্ন, ময়মনসিংহে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা, ঢাকায় সংবাদমাধ্যমে অগ্নিসংযোগ, লক্ষ্মীপুরে রাজনৈতিক পরিবারের ওপর ভয়াবহ আগুন। ঘটনাস্থল ভিন্ন, ভুক্তভোগী ভিন্ন—কিন্তু পদ্ধতি এক। উসকানি- আবেগ- সহিংসতা- আগুন। এই প্যাটার্ন কি ইঙ্গিত দেয় না যে, কেউ বা কোনো গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে দেশকে অস্থিতিশীল প্রমাণ করতে চাচ্ছে? বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে একটি সহিংস, অনিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরাই কি তাদের উদ্দেশ্য নয়? ইতোমধ্যে পুলিশ এসব ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু গ্রেফতারই শেষ কথা নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নিরপেক্ষ, গভীর ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত। কারা উসকানি দিয়েছে? কার নির্দেশে এসব ঘটেছে? সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মাঠ পর্যন্ত নির্দেশনার চেইন কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বের না হলে, আগুন থামবে না। আজ ঘর পুড়ছে, কাল পুড়বে রাষ্ট্রের ভীত। সময় এসেছে আবেগ নয়, বিবেক দিয়ে ভাবার। সময় এসেছে ‘কে বললো’ নয়, ‘কেন বললো’—এই প্রশ্ন তোলার। সময় এসেছে বোঝার—আগুন লাগানোর নির্দেশ যারা দেয়, তারা কখনো সামনে থাকে না; তারা থাকে ছায়ায়। সত্য উদঘাটন না হলে, এই আগুন শুধু মানুষ নয়—দেশের স্থিতিশীলতা, মানবিকতা ও ভবিষ্যৎকেও পুড়িয়ে দেবে। প্রশ্ন তাই একটাই— আগুন কারা লাগাচ্ছে, আর কেন? এতে কার লাভ?
লেখক: আমিনুর রহমান জিলু
সাংবাদিক ও কলাম লেখক
তারিখ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ইং